বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য বৈশাখ উদযাপনকে ঘিরে কক্সবাজারজুড়ে মেলা, লোকজ সংস্কৃতি ও নানা আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। গ্রামবাংলার আলপনায় সাজানো হচ্ছে হোটেল-মোটেল জোনের তারকা হোটেলগুলো। অনেক হোটেলই অতিথিদের জন্য সাশ্রয়ী বিভিন্ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বৈশাখ বরণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।
ঈদ ও থার্টিফার্স্ট নাইটের আদলে লোকসমাগমের সম্ভাবনা মাথায় রেখে বাড়তি নিরাপত্তার বিষয়েও ভাবছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ইতোমধ্যে নিরাপত্তা বলয় তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এবারের ঈদের ছুটির সঙ্গে নানা ছুটি মিলিয়ে প্রায় ১০ দিনের বন্ধ ছিল। তখন থেকেই কক্সবাজারে লোকসমাগম বাড়তে শুরু করে। সাপ্তাহিক খোলার দিনগুলোতে পর্যটক কম এলেও সাপ্তাহিক ছুটিতে ভিড় ছিল ভালো। সেই ধারাবাহিকতায় পহেলা বৈশাখেও পর্যটন নগরী সরগরম থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলা নববর্ষ বরণে ভ্রমণপিপাসুরা কক্সবাজারে ছুটে আসবেন—এমন ধারণা থাকলেও অনেক তারকা হোটেল, গেস্ট হাউস, কটেজ ও আবাসন প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং তুলনামূলক কম। কক্ষ বুকিং হয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদের ছুটি খুব বেশি দিন আগে শেষ না হওয়া এবং সার্বিক পরিস্থিতির কারণেই বুকিং কম।
তবে এরই মধ্যে অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। চৈত্রের কাঠফাটা রোদের মধ্যেও মেঘ-রোদ্দুরের খেলায় সৈকতের ঢেউ ছুঁয়ে আনন্দ উপভোগ করছেন আগত পর্যটকরা।
ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী এখন পর্যটন মৌসুমের শেষ সময়। সাধারণত চৈত্র-বৈশাখের দাবদাহে কক্সবাজারে পর্যটক সমাগম অনেক কমে যায়। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় এ সময়েও কমবেশি পর্যটক উপস্থিতি রয়েছে।
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের বিপণন ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নূর সুমেল জানান, আগের বছরের মতো এবারও বাংলা নববর্ষ বরণ উপলক্ষে পহেলা থেকে ৪ বৈশাখ পর্যন্ত চার দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ৯টায় হোটেল প্রাঙ্গন থেকে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হবে। তিনি বলেন, বাঙালিয়ানার আবহকে পূর্ণতা দিতে মেলায় বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা পণ্যের স্টল বসানো হচ্ছে। বিকেলে থাকবে হাড়িভাঙা, বালিশ খেলা ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। সন্ধ্যায় থাকবে লোকজ সংস্কৃতির আয়োজন এবং বৈশাখী ভোজসহ সাশ্রয়ী প্যাকেজ।
শুধু ওশান প্যারাডাইস নয়, পৃথকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে তারকা হোটেল রামাদা, সায়মন, কক্স-টু-ডে, লংবিচ, বেস্ট ওয়েস্টার্ন, মারমেড ও গ্রীণনেচারসহ আরও বেশ কিছু হোটেল। ইনডোরে তারকা হোটেলগুলো নিজেদের মতো উৎসব আয়োজন করলেও অন্যান্য হোটেল, গেস্ট হাউসগুলো প্রশাসনের র্যালি ও অনুষ্ঠানে অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বৈশাখ উপলক্ষে ছোট-বড় আবাসিক প্রতিষ্ঠানেও কিছুটা ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, কক্সবাজার সরকারি কলেজ, কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজসহ জেলা-উপজেলার প্রায় প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।
সোমবার হোটেল-মোটেল জোন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষবরণ উপলক্ষে নিজ নিজ হোটেল এলাকায় বৈশাখী ঐতিহ্যের রঙের আঁচড় লাগাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বাঙালিয়ানার আবহে সাজানো হচ্ছে পুরো পরিবেশ।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, আবাসিক হোটেল, গেস্ট হাউস, কটেজ ও সরকারি রেস্ট হাউসে প্রায় সোয়া লাখ মানুষের রাতযাপনের সুবিধা রয়েছে। গরমের সময় এবং ঈদের ছুটি মাসের শুরুতে শেষ হয়ে যাওয়ায় পর্যটকদের ঢল না থাকলেও মোটামুটি দর্শনার্থী আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি জানান, সমুদ্রসৈকতের পাশাপাশি সাফারি পার্ক ও মহেশখালীর আদিনাথেও পর্যটকদের পদচারণা বাড়তে পারে।
বাংলা নববর্ষের আয়োজনে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। পর্যটকদের চাপ বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় পর্যটন স্পটগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সৈকতে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।
কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, পর্যটক নিরাপত্তাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিশ্চিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটন জোনের বিভিন্ন স্থানে র্যাবের বিশেষ টহলও থাকবে।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে পর্যটনকে বিকশিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে বৈশাখের বৈচিত্র্যময় আয়োজন কক্সবাজারে প্রতি বছরই থাকে, এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। তিনি জানান, জেলা প্রশাসন সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করবে। জেলা শহরের প্রায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং পর্যটন সংশ্লিষ্টরা এতে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি এ আয়োজনে পর্যটকদেরও অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
0 Comments