বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্টেশনটি ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। সংস্থাটির সূত্রে জানা গেছে, আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউই দরপ্রস্তাব জমা দেয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দরপত্রের কিছু শর্তের কারণেই আগ্রহী ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে দরপ্রস্তাব জমা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। শর্ত অনুযায়ী, স্টেশনটি ১০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার কথা ছিল, তবে ব্যবসায়ীরা তা ২০ বছরের জন্য চান। একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এককালীন ৫ কোটি টাকা এবং পারফরম্যান্স সিকিউরিটি হিসেবে আরও ১৫ কোটি টাকা জমা দেওয়ার শর্তও রাখা হয়েছিল। রেলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব শর্ত নিয়েই ব্যবসায়ীরা আপত্তি তুলেছেন।
রেলওয়ে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনটি হোটেল ও ট্যুরিস্ট ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দেশি-বিদেশি বা যৌথ অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দ্রুত সময়ের মধ্যে ইজারা দিতে চায়। নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান স্টেশনটির রক্ষণাবেক্ষণ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ এবং কর্মচারী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে। এর বিনিময়ে স্টেশনটির নকশাকৃত ফ্লোরে থাকা স্থাপনাগুলো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিতে পারবে। চুক্তিমূল্যের ওপর প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে ভাড়া বৃদ্ধির শর্তও রাখা হয়েছে।
রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্টেশনটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হতে পারে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এত বড় বিনিয়োগ থেকে তারা প্রত্যাশিত মুনাফা পাবেন না। সে কারণেই তারা চুক্তির কিছু শর্ত পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।
গত ২৫ জানুয়ারি কক্সবাজার স্টেশন ইজারার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দরপত্রে বলা হয়, আইকনিক স্টেশনটি অত্যাধুনিক স্থাপত্য নকশা ও উন্নত ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমসমৃদ্ধ। ছয়টি তলাজুড়ে বিস্তৃত এ স্থাপনায় রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন সেবা, টিকিট কাউন্টার, রিটেইল শপ, ডিপারচার ও ওয়েটিং লাউঞ্জ, নিরাপদ লকার, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, পণ্য প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং প্রার্থনা কক্ষ। অতিরিক্ত সুবিধার মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, খুচরা বিক্রয় কেন্দ্র, ৩৯ কক্ষের একটি হোটেল, অফিস স্পেস এবং একটি বহুমুখী হল। ফলে এটি একটি সমন্বিত ও বহুমুখী পরিবহন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েই এই স্থাপনাটির রক্ষণাবেক্ষণ করছে। উচ্চমানের ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এই স্থাপনাটির স্মার্ট, সুবিধাজনক, টেকসই এবং ব্যাপক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সর্বোত্তম রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন ভেন্ডর বা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই নিয়োগ বার্ষিক নির্দিষ্ট রাজস্বের ভিত্তিতে হওয়ার কথা, যা চুক্তির মেয়াদে প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে বাড়বে।
দরপ্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ৫ মার্চ। রেল ভবন সূত্রে জানা গেছে, আটটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র কিনলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউই প্রস্তাব জমা দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আগের দরপত্র পর্যালোচনা করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, দরপত্র সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ইতোমধ্যে একটি সভা হয়েছে। সেখানে ব্যবসায়ীরা দরপত্রের শর্ত নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু পয়েন্ট তুলে ধরেছেন এবং লিখিতভাবে বিস্তারিত জানানোর কথাও বলেছেন। যদিও এখনো তাদের কাছ থেকে লিখিত কোনো প্রস্তাব পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, রেলওয়ের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি মাথায় রেখেই দরপত্রটি তৈরি করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা কিছু বিষয়ে আপত্তি তোলায় এখন তা পর্যালোচনা করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হবে।
প্রসঙ্গত, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় নির্মিত হয়েছে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন। স্টেশনটি ২২ দশমিক ৭২ একর জমির ওপর মোট ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৬৭ বর্গফুট এলাকাজুড়ে অবস্থিত। ২০২৩ সালের নভেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ওই বছরের ডিসেম্বরে স্টেশনটির কার্যক্রম শুরু হয়।
0 Comments