সিবি ডেক্স: কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডোর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সীমান্ত এলাকায় তীব্র প্রভাব পড়েছে। ১১ মাস ধরে স্থলবন্দর বন্ধ এবং চার বছর ধরে করিডোর অচল থাকায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার মধ্যে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে পাঠানো প্রায় ৯৩ লাখ ডলারের পণ্যও আটকে রয়েছে।
সরেজমিনে কেরুনতলী ও সাবরাং ইউনিয়নের নাফ নদীর তীরে দেখা যায়, একসময় জমজমাট বন্দর ও করিডোর এখন প্রায় জনশূন্য। যেখানে আগে ট্রাক, কার্গো বোট ও শ্রমিকদের ব্যস্ততা ছিল, সেখানে এখন তালাবদ্ধ গুদামঘর ও ফাঁকা ঘাট।
স্থানীয়দের মতে, বন্দর ও করিডোরকেন্দ্রিক ব্যবসা, শ্রমিক ও পরিবহন খাতের প্রায় অর্ধলাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। জীবিকার সংকটে অনেকেই বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সীমান্ত এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
দক্ষিণ চতলা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ কাশেম, যিনি প্রায় এক দশক ধরে মিয়ানমার থেকে আসা পশুবাহী ট্রলার খালাসের কাজ করতেন, বলেন— চার বছর ধরে করিডোর বন্ধ থাকায় তার দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পরিবার নিয়ে কঠিন সময় পার করছেন তিনি।
এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাণিজ্য পুনরায় চালু করা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের কিছু পদক্ষেপে আশার আলো দেখা যাচ্ছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ জানান, স্থলবন্দর চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে লাখো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে রয়েছেন।
ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, গত বছরের এপ্রিল থেকে সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ থাকায় প্রতি মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা করে তাদের প্রায় তিন কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।
কাস্টমস ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মিয়ানমার থেকে ১ লাখ ৯৯ হাজার ২২৫ টন পণ্য আমদানি হয়ে ৪০৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ৭৫৭ টনে, রাজস্ব এসেছে ১০৮ কোটি টাকা।
স্থানীয় শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ করিম বলেন, বন্দর চালুর খবর শুনে শ্রমিকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে, কারণ প্রায় ১০ হাজার শ্রমিকের জীবিকা এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।
অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ওমর ফারুক (সিআইপি) জানান, সরকার বন্দর চালুর বিষয়ে আন্তরিক এবং দ্রুত চালু হলে কর্মসংস্থান ফিরবে, ব্যবসায়ীরাও ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে, যা দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। পাশাপাশি পূর্বে ইস্যুকৃত ব্যাংক ড্রাফটের বিপরীতে মিয়ানমারে আটকে থাকা পণ্য নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থার ওপরও জোর দেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডোর পুনরায় চালু হলে সীমান্ত এলাকার অর্থনীতি ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা নতুনভাবে সচল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
0 Comments