বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের দ্বৈত ও দোদুল্যমান চরিত্র বিশ্লেষণ করে সমাজবিজ্ঞানী ড. হেলাল মহিউদ্দীন একে ‘মধ্যদ্বিত্ব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মধ্যবিত্ত কেবল আয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত কোনো অর্থনৈতিক শ্রেণি নয়, বরং এটি একটি বিশেষ মানসিকতা ও সাংস্কৃতিক অবস্থান। এই বর্গটি অন্যায়-অবিচারে ক্ষুব্ধ হলেও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে স্থির থাকতে পারে না এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা সুবিধার প্রলোভনে দ্রুত আপস করে।
ড. হেলাল মহিউদ্দীন তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন, বিশ্বায়ন ও নয়া-উদার বাজারচিন্তা মধ্যবিত্তকে চিত্তের উন্নয়ন থেকে সরিয়ে কেবল বিত্তকেন্দ্রিক উদ্বেগে আবদ্ধ করছে। তিনি ‘রিচ ড্যাড, পুওর ড্যাড’ দর্শন এবং এমএলএম বা পিরামিড স্কিমের উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করেন যে, এসব প্রলোভন মধ্যবিত্তকে সমাজচিন্তা থেকে বিযুক্ত করে ফেলছে। পশ্চিমে একসময় মধ্যবিত্ত গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে শক্তিশালী ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে তারা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সমাজবিজ্ঞানী জানান, এখানকার মধ্যবিত্তের বিকাশ ঐতিহাসিকভাবে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে একটি শক্তিশালী নাগরিক সমাজ গঠনের সুযোগ থাকলেও দুর্নীতি ও সুবিধাবাদী রাজনীতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। ফলে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত একটি দিকনির্দেশনাহীন বর্গে পরিণত হয়েছে। লেখকের মতে, দেশে গণতন্ত্রহীনতা ও সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রের ঝুঁকির পেছনে এই মধ্যবিত্ত বর্গের আপসকামীতা এবং রাজনীতিবিযুক্ততা অন্যতম প্রধান কারণ।
ড. হেলাল মহিউদ্দীন বর্তমানে কানাডার কনফ্লিক্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক এবং যুক্তরাষ্ট্রের মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তার এই বিশ্লেষণটি মূলত মধ্যবিত্তের সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্র বোঝার একটি নতুন দৃষ্টিকোণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
মধ্যবিত্ত কি কেবল একটি অর্থনৈতিক শ্রেণি নাকি বিশেষ মানসিকতা? বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের দ্বৈত চরিত্র ও রাজনৈতিক বিযুক্তি নিয়ে সমাজবিজ্ঞানী ড. হেলাল মহিউদ্দীনের বিশ্লেষণ।


0 Comments