মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক অফিস সহকারী ফজলুর রহমানকে, যিনি রুনাকে ছুরিকাঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান এবং বিভাগের সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস। এর আগে শ্যাম সুন্দর সরকার ওই বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আর বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকে কিছুদিন আগে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা ছাত্রী হলে বদলি করা হয়েছিল।
ইবি থানার অফিসার ইনচার্জ মাসুদ রানা জানান, চারজনকে আসামি করে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ১০৯ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশ কাজ করছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া রুনা সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভাগের আগের সময়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্বামীর অভিযোগ অনুযায়ী, বিভাগীয় কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস রুনাকে বলেন যে তিনি যেন তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কাগজপত্রে শুধু স্বাক্ষর করেন। কিন্তু রুনা এতে রাজি না হয়ে বিভাগীয় তহবিল স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ব্যবহারের কথা জানান। এরপর থেকেই তার সঙ্গে বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস ও শিক্ষক শ্যাম সুন্দর সরকারের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস ও শ্যাম সুন্দর সরকার অফিস সহায়ক ফজলুর রহমানকে দিয়ে বিভিন্ন সময়ে রুনাকে অসহযোগিতা ও হেনস্তা করান। এ ঘটনায় ফজলুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে তিনি লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে পরবর্তীতেও একই ধরনের আচরণ অব্যাহত থাকে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, এক পর্যায়ে ফজলুর রহমান বিভাগের শিক্ষক হাবিবুর রহমানের সামনেই রুনার সঙ্গে অপমানজনক আচরণ করেন। বিষয়টি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. রোকসানা মিলিকে জানানো হলে তিনি বিভাগে একাডেমিক কমিটির সভা আহ্বানের নির্দেশ দেন। ওই সভায় প্রশাসনিক কারণে ফজলুর রহমানকে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর রহমান।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান ফজলুর রহমানকে বিভাগে বহাল রাখার বিষয়ে রুনাকে চ্যালেঞ্জ জানান। একই সঙ্গে তিনি প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর বিভাগের সভাপতি হওয়ার দুরভিসন্ধি পোষণ করছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে প্রশাসনিকভাবে ফজলুর রহমানকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয় এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসকেও ছাত্রী হলে বদলি করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, এই প্রেক্ষাপটেই বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমানের প্ররোচনা ও নির্দেশনায় ফজলুর রহমান ধারালো ছুরি নিয়ে রুনার অফিস কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে তাকে হত্যা করেন।
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার বলেন, সহকর্মীর মৃত্যুতে তারা শোকাহত এবং তার সঙ্গে তাদের এমন কোনো সম্পর্ক ছিল না যে তারা হত্যার নির্দেশ দেবেন। বিষয়টি তদন্তাধীন এবং সময়ের সঙ্গে সব পরিষ্কার হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্য অভিযুক্ত শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, তিনি এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান। যদি তিনি নিজেও এতে জড়িত থাকেন, তবে নিজের শাস্তিও দাবি করেন।
অপর অভিযুক্ত বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে মামলার প্রধান আসামি ফজলুর রহমান হত্যার দায় স্বীকার করে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্র। বুধবার রাত থেকে তিনি কথা বলতে না পারলেও সাড়া দিচ্ছেন এবং কলম দিয়ে লিখে উত্তর দিচ্ছেন।
পুলিশ ও চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাতেই পুলিশের কর্মকর্তারা তার দুই পাতার লিখিত বক্তব্য সংগ্রহ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বিভাগীয় প্রধান তাকে বদলি এবং বেতন বন্ধ করে দেওয়ায় তার মনে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, বুধবার বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের ২২৬ নম্বর কক্ষে কর্মচারী ফজলুর রহমান আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাত করেন। পরে একই কক্ষে তিনি নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বাদ জোহর কুষ্টিয়া পৌর ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে তাকে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
0 Comments