স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর কেবল ক্ষমতার পালাবদলই যথেষ্ট নয়, বরং সমাজের বহুমুখী সংকট নিরসনে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে গ্যেটে ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে জার্মান দার্শনিক ইয়ুর্গেন হেবারমাসের দর্শন নিয়ে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক স্মরণ সিম্পোজিয়ামে এই অভিমত উঠে আসে। বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে গ্যেটে ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুং বাংলাদেশ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সহযোগিতা করে। সিম্পোজিয়ামে বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আহমেদ জাভেদ চৌধুরী বলেন, শুধু কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না, বরং সমাজের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে মানুষের পারস্পরিক আলোচনা চালু রাখাই আসল কাজ। তিনি গণতন্ত্র সুদৃঢ় করা, সত্য উদ্ঘাটন এবং বৈষম্য ও অসহায়ত্ব হ্রাসের জন্য সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনারারি অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ তার প্রবন্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের যোগাযোগের নানা দিক তুলে ধরে জানান যে, মূলধারার বাইরে সামাজিক মাধ্যম বিকল্প মত প্রকাশের সুযোগ তৈরি করলেও এটি মেরুকরণও বাড়াতে পারে। তাই ডিজিটাল মাধ্যমকে যুক্তিনির্ভর গণতান্ত্রিক চর্চায় ব্যবহারের তাগিদ দেন তিনি। একই বিভাগের অধ্যাপক এস আমিনুল ইসলাম আধুনিক সমাজের কাঠামোগত বিষয় ব্যাখ্যা করে জানান, রাষ্টীয় ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে প্রভাবিত করলে সমাজে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া ঢাকায় জার্মান দূতাবাসের উপমিশনপ্রধান ড্যানিয়েল ব্লুম বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যকার চিন্তাধারার আদান-প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেন। ফ্রিডরিখ-এবার্ট-স্টিফটুংয়ের আবাসিক প্রতিনিধি ফেলিক্স গের্দেস জ্ঞানচর্চা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কের কথা বলেন, এবং গ্যেটে ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের পরিচালক ফ্র্যাঙ্ক ওয়ার্নার আধুনিক গণতন্ত্রে বাণিজ্যিকীকরণ ও সামাজিক মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরে সংকট উত্তরণে দার্শনিক চিন্তার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। দিনব্যাপী এই আয়োজনে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
স্বৈরাচার পতনই শেষ কথা নয়, সমাজের সংকট দূর করতে এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে মানুষের মধ্যে যুক্তিনির্ভর সংলাপ ও আলোচনা অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়েছেন আলোচকরা।


0 Comments