যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য ফ্যাক্টচেক করতে গিয়ে গত ১০ বছরে আট হাজার পাঁচশটির বেশি মিথ্যা দাবি নথিভুক্ত করেছেন সিএনএনের সাংবাদিক ড্যানিয়েল ডেল। দীর্ঘ এক দশকের অভিজ্ঞতায় ট্রাম্পের মিথ্যাচারের ধরন, এর রাজনৈতিক প্রভাব এবং গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া নিয়ে ১৫টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন তিনি। ১০ বছর আগে টরন্টো স্টারের ওয়াশিংটন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করার সময় ট্রাম্পকে ফ্যাক্টচেক করার কাজ শুরু করেন ড্যানিয়েল ডেল। তখন ট্রাম্প ছিলেন ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা প্রার্থী। তার বক্তব্যে অস্বাভাবিক মাত্রায় অসত্য তথ্য থাকলেও সেগুলোর খুব কমই যাচাই করে প্রকাশ্যে সংশোধন করা হচ্ছিল। ডেল ভেবেছিলেন ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে যাবেন এবং তার এই ছোটখাটো প্রকল্পও দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয় এবং ট্রাম্প নির্বাচনে জয়ী হন। ডেল জানান, ট্রাম্পের ধারাবাহিক অসত্য বক্তব্য এখন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। ২০২০ সালের নির্বাচনের দুই মাস আগে প্রতিটি ট্রাম্প বক্তব্য ফ্যাক্টচেক করার চার বছরের প্রকল্পটি বন্ধ করতে বাধ্য হন ডেল। কারণ ট্রাম্প এত বেশি মিথ্যা দাবি করছিলেন যে সবগুলো যাচাই করা সম্ভব হচ্ছিল না। ততদিনে সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে তিনি ট্রাম্পের সাড়ে আট হাজার মিথ্যা দাবি নথিভুক্ত করেছিলেন। ২০২১ সালে ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পর কিছু সময়ের জন্য তাকে ফ্যাক্টচেক করা থেকে বিরতি নেন ডেল। কিন্তু দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে আসেন এবং ২০২২ সালে তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়া ভাষণেই ডেল কুড়ির বেশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর দাবি শনাক্ত করেন। ডেলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জো বাইডেন, জেডি ভ্যান্স, কংগ্রেসের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট সদস্য কিংবা মন্ত্রিসভার সদস্যরাও কখনো কখনো মিথ্যা বলেন। কিন্তু ট্রাম্পের মতো ধারাবাহিকভাবে এবং এত বিপুলসংখ্যক বিষয়ে মিথ্যা বলা ওয়াশিংটনের অন্য কোনো রাজনীতিকের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। রাজনৈতিক সংকটে পড়লেই ট্রাম্পের মিথ্যা বলার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে মনে করেন ডেল। ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন, ২০১৯ সালের ইউক্রেন কেলেঙ্কারি, ২০২০ সালের করোনা মহামারি এবং ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন; প্রতিটি বড় রাজনৈতিক সংকটের সময় ট্রাম্পের মিথ্যা বক্তব্যের প্রবাহ আরও বেড়েছিল। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়াও বয় স্কাউটসের কাছ থেকে ফোন পাওয়ার দাবি বা মিশিগানের ম্যান অব দ্য ইyar পুরস্কার পাওয়ার দাবির মতো তুচ্ছ বিষয়েও তিনি অসত্য গল্প বলেছেন বলে জানান ডেল। ট্রাম্পের একই মিথ্যা বারবার পুনরাবৃত্তি করার প্রবণতা রয়েছে। ডেলের মতে, ট্রাম্প শুধু নিজে মিথ্যা তৈরি করেন না, অন্যদের তৈরি ষড়যন্ত্র তত্ত্বও তিনি প্রায়ই গ্রহণ করেন এবং সেগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করেন। ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন যে তার বক্তব্যকে ভুল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু সংশোধনের পরও তিনি একই দাবি আবার করেছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা তার মিথ্যা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও দ্বিতীয় মেয়াদে তার চারপাশে এমন অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন যারা প্রকাশ্যে তার ভুল দাবিকেও সঠিক বলে সমর্থন করেন। ডেল আরও উল্লেখ করেছেন যে ট্রাম্পের মিথ্যাচারের কারণে ক্যাপিটল হিলে হামলা এবং করোনা মহামারির সময়ে মানুষের মৃত্যুর মতো গভীর ক্ষতি হয়েছে। সাংবাদিক, বিচারক ও নির্বাচনকর্মীদের মতো নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা তার বক্তব্যের কারণে হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা এই মিথ্যাচারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিথ্যাচারের ধরন ও এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ১৫টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন সিএনএনের সাংবাদিক ড্যানিয়েল ডেল।


0 Comments