ফেনী জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ কিংবা উল্লেখযোগ্য কোনো শিল্পকারখানা গড়ে না উঠলেও রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সুযোগযোগ ব্যবস্থার কারণে মফস্বল শহরটির ক্রমবিকাশ ঘটছে। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী অধ্যুষিত এই জেলা রেমিট্যান্স আহরণে সারা দেশে শীর্ষে রয়েছে। ফলে শহরটিতে সুউচ্চ বহুতল ভবনের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি জমির দামও উল্লেখযোগ্যহারে বাড়তির দিকে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালে পাঠানবাড়ি সংলগ্ন এলাকায় ৬ জন বেসরকারি চাকরিজীবী প্রতি শতক ২২ লাখ টাকায় ৬ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করলেও বর্তমানে আশপাশের জমির প্রতি শতকের দাম ৫০ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। এছাড়া শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কের ইসলামপুর রোড সংলগ্ন ৫ শতাংশ জমি ৯ কোটি টাকায় বেচাকেনা হয়েছে এবং ফেনী সদরের এক প্রবাসী ওই জমি কিনে চার তলা ভবনটি ছয় তলায় উন্নীত করেছেন। অথচ সরকারি হিসাবে রামপুর মৌজায় প্রতি শতক জমির দাম প্রায় ৯৯ লাখ টাকা এবং পাগলা মিয়া সড়কের পাশে ৬ লাখ টাকার নাল জমি ৩০ লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ২৭ দশমিক ২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই শহরের ১৮টি ওয়ার্ডে প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জমির দাম ও নির্মাণসামগ্রীর ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষেরা বাড়ি করতে না পেরে জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন, যা গ্রামাঞ্চলের প্রবাসীরা কিনে বাড়ি করছেন কিংবা ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে নির্মাণ করা হচ্ছে। আলিফ ভিশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপক এবং আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মু. ফজলুল হক জানান, শিল্পায়ন না বাড়লেও শহরের আকার বাড়ায় এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে জমির চাহিদা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবাসীরা নিরাপদ বিনিয়োগ এবং সন্তানদের পড়াশোনা ও উন্নত শহরের জীবনের টানে গ্রামমুখী হতে চান না। ফেনী সিটি গার্লস হাইস্কুল ও শান্তি নিকেতন ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক এম. মামুনুর রশিদ উল্লেখ করেন, তার প্রতিষ্ঠানের দেড় হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ ফেনী শহরের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ায় আবাসিক এলাকায় বাসাবাড়ির চাহিদা ও ভাড়াও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামী ব্যাংক ফেনী শাখার ব্যবস্থাপক শহীদুল আলম জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের শাখায় ২৩০ কোটি টাকা রেমিট্যান্স এসেছে এবং গত আগস্ট মাসে প্রবাসীরা ৩০ কোটি টাকা পাঠিয়েছেন। ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি আমান উদ্দিন কায়সার সাব্বির জানান, যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় এবং আশপাশের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দারা ফেনীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্বচ্ছল ব্যক্তিরা ফ্ল্যাট বা বাড়ি করতে আগ্রহী হচ্ছেন। সম্প্রতি ফেনীতে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংরক্ষিত নারী সদস্য রেহানা আক্তার রানু প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করায় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়ায় জমির চাহিদা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও চাঁদার কারণে স্থবিরতা থাকলেও পটপরিবর্তনের পর সেই বাধা দূর হওয়ায় জমি কেনাবেচা বেড়েছে। ফেনী জেলা রেজিস্ট্রার (চলতি দায়িত্ব) আবদুর রহমান মুহাম্মদ তামিম জানান, নির্দিষ্ট সময়ে জেলার ৭টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৩৯ হাজার ৩৫০টি দলিল রেজিস্ট্রি থেকে ২২১ কোটি ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬২ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে এবং বর্তমান সরকারের পদক্ষেপে এ খাতে রাজস্ব আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিল্পকারখানা না থাকলেও রেমিট্যান্স ও যোগাযোগের সুবাদে ফেনী শহরে বাড়ছে জমির দাম, বহুতল ভবন ও আবাসন খাতের ব্যবসা।


0 Comments