বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে। বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে ঐতিহাসিক গণভোট শুরু হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একযোগে দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ ও গণনা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যালট বাক্স ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং প্রিসাইডিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ইসি সূত্র অনুযায়ী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মাঠে রয়েছেন। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছেন এক লাখ আট হাজারেরও বেশি।
সারা দেশের প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে ২৫ হাজার ৭০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। যেকোনো বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার তথ্য দ্রুত জানাতে চালু রয়েছে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ এবং অভিযোগ গ্রহণের জন্য হটলাইন নম্বর ৩৩৩।
এবার মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। সারা দেশে ভোটগ্রহণ হচ্ছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে।
৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত থাকায় ২৯৯টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। মোট ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি প্রবাসী ব্যালট দেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার ৩৮টি ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তারা গ্রহণ করেছেন। এসব পোস্টাল ব্যালট মূল ভোট গণনার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
২০০৮ সালে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরুর পর এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। মোট প্রার্থী সংখ্যা ২ হাজার ২৯ জন; এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮০ জন। এবারের নির্বাচনে ১১৯টি নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিতে ঢাকায় এসেছেন ৩৯৪ জন বিদেশি নির্বাচনি পর্যবেক্ষক এবং ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক। পাশাপাশি মাঠে রয়েছেন ৫৫ হাজারের বেশি দেশীয় পর্যবেক্ষক।
গণভোটের কারণে ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হবে। গণনা শেষে কেন্দ্রের নোটিশ বোর্ডে ফলাফল টানানো হবে এবং ধাপে ধাপে ফল প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা, ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। দীর্ঘ সংস্কার প্রক্রিয়ার পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশজুড়ে যেমন ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশা। এখন পুরো দেশ তাকিয়ে রয়েছে ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের দিকে।
0 Comments