ব্রেকিং নিউজ

ব্রেকিং নিউজ

শত্রু থেকে একনিষ্ঠ অনুসারী: সাহাবি সুমামা ইবনে উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস

শত্রু থেকে একনিষ্ঠ অনুসারী: সাহাবি সুমামা ইবনে উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস

ইসলামের ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে চরম পাষাণ হৃদয় মোমের মতো গলেছে, শত্রু পরিণত হয়েছে বন্ধুতে এবং অন্ধকারের যাত্রী খুঁজে পেয়েছে হেদায়েতের অমল আলো। সাহাবি সুমামা ইবনে উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা এমনই এক ঐতিহাসিক ও বিস্ময়কর অধ্যায়। একসময় যিনি ছিলেন ইসলামের ঘোরতর বিরোধী এবং নবীজির প্রতি যাঁর অন্তরে ছিল অন্ধ বিদ্বেষ, তিনিই পরবর্তী সময়ে নবীজির প্রেমে আত্মহারা একনিষ্ঠ অনুসারীতে পরিণত হন। তাঁর অন্তরের পর্বতসম ঘৃণার জায়গা দখল করে নিয়েছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা; আর বৈরিতার জায়গায় জন্ম নিয়েছিল ইস্পাতকঠিন ইমান। এই রূপান্তরের পেছনে কোনো সামরিক শক্তি বা জোরজবরদস্তি ছিল না; এর পেছনে কাজ করেছিল নবীজির অনুপম চরিত্রমাধুর্য, বন্দীর প্রতি মানবিক আচরণ ও অতুলনীয় ক্ষমার শক্তি। বর্তমান রিয়াদের পার্শ্ববর্তী উর্বর ইয়ামামা অঞ্চলে বাস করত প্রভাবশালী বনু হানিফা গোত্র। সেই গোত্রের অবিসংবাদিত নেতা ও প্রতাপশালী শাসক ছিলেন সুমামা ইবনে উছাল। নবীজির শান্তির দাওয়াত মক্কা ও মদিনার গণ্ডি পেরিয়ে সমগ্র আরব উপদ্বীপে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সময় সুমামার কাছেও এই আহ্বান পৌঁছেছিল। কিন্তু বংশীয় অহংকার ও ক্ষমতার দম্ভে তিনি সত্যকে অস্বীকার করেন এবং নবীজিকে হত্যার চক্রান্ত ও কয়েকজন সাহাবিকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এরপর নজদের দিকে পরিচালিত এক সামরিক অভিযান শেষে মদিনার অশ্বারোহী সাহাবিদের একটি দল ফেরার পথে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে আটক করে মসজিদে নববির একটি পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখে। রাসুল (সা.) মসজিদে প্রবেশ করে বন্দীর দিকে তাকাতেই তাঁকে চিনতে পেরে সাহাবিদের জানান যে ইনি ইয়ামামার গোত্রনেতা সুমামা ইবনে উসাল। এরপর তিনি সাহাবিদের সুমামার সঙ্গে ভালো আচরণ করার নির্দেশ দেন। শত্রুর প্রতি নবীজির ব্যবহার ছিল এক অলৌকিক শিক্ষা। তিনি নিজের বাড়ি থেকে সুমামার জন্য বিশেষ খাবার পাঠাতেন এবং সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর উটনীর দুধ দোহন করে সুমামাকে পান করাতেন। বন্দিদশায় কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন তো দূরের কথা, তাঁর নেতৃত্বের আত্মমর্যাদায় সামান্য আঘাতও দেওয়া হয়নি। রাসুল (সা.) প্রতিদিন সুমামার কাছে আসতেন এবং পরম স্নেহের সঙ্গে তাঁর খোঁজ নিতেন। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন নবীজি জিজ্ঞাসা করার পর সুমামা আত্মমর্যাদা নিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন যে, হত্যা করলে রক্তপরাধীকেই হত্যা করা হবে, মুক্তি দিলে কৃতজ্ঞ মানুষকেই দয়া করা হবে এবং সম্পদ চাইলে তা-ই দেওয়া হবে। তৃতীয় দিন আলোচনা শেষে রাসুল (সা.) কোনো মুক্তিপণ বা শর্ত আরোপ না করে সাহাবিদের সুমামাকে বাঁধনমুক্ত করে দেওয়ার ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। শর্তহীনভাবে মুক্তি পেয়ে সুমামা মসজিদ থেকে বের হয়ে মসজিদের অদূরে এক খেজুরবাগানে কূপের শীতল পানিতে গোসল করে পুনরায় মসজিদে নববিতে ফিরে আসেন। নবীজির সামনে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে তিনি কলেমা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে স্বীকার করেন যে, একসময় নবীজি, তাঁর ধর্ম ও তাঁর শহর তাঁর কাছে সবচেয়ে অপছন্দের হলেও এখন তিনিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয়। ইসলাম গ্রহণের পর সুমামা ওমরাহ করার অনুমতি চাইলে নবীজি তাঁকে নিয়মানুযায়ী ওমরাহ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। তিনি মক্কায় প্রবেশ করে কাফেলা নিয়ে প্রকাশ্যে উচ্চকণ্ঠে তালবিয়া পাঠ করতে লাগলে কোরাইশরা এসে তাঁকে ঘিরে ধরে বেইমান হওয়ার অভিযোগ করে। সুমামা নির্ভীক কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে তিনি মুহাম্মাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছেন এবং আল্লাহর শপথ করে জানান যে, আল্লাহর নবী অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত ইয়ামামা থেকে মক্কায় গমের একটি দানাও আর আসবে না। সুমামা ইয়ামামায় ফিরে গিয়ে খাদ্য সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে তৎকালীন মক্কায় তীব্র দুর্ভিক্ষ ও খাদ্যাভাব দেখা দেয়। নিরুপায় হয়ে কোরাইশ নেতারা নবীজির কাছে আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে চিঠি লিখলে নবীজি সুমামাকে খাদ্য সরবরাহ চালুর নির্দেশ দেন।

সংক্ষেপে:
নবীজির অনুপম চরিত্র ও ক্ষমার শক্তিতে শত্রু থেকে ইসলামের অনুসারীতে রূপান্তরের ঐতিহাসিক ঘটনা সুমামা ইবনে উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের প্রেক্ষাপট।
শত্রু থেকে একনিষ্ঠ অনুসারী: সাহাবি সুমামা ইবনে উসাল (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস

0 Comments