দীর্ঘ দুই দশক ধরে অবস্থানের পর ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই ইরাক ছেড়ে চলে গেছেন দেশটিতে থাকা শেষ মার্কিন সেনারা। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে নতুন একটি দিনের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে দেশটির সরকার। তবে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের এই ঘটনায় ইরাকি জনগণের মধ্যে আনন্দ ও উদ্বেগের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
আল–জাজিরার কাছে ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইরাকে এখন আর মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সদস্য নেই। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরাকি বাহিনী সম্পূর্ণ সক্ষম বলে দাবি করেছে মন্ত্রণালয়। ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার অংশ হিসেবে এই সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হলো। সে সময় দেশটিতে আড়াই হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছিলেন। গত বছর তাঁদের সিংহভাগকে সরিয়ে নেওয়া হলেও কুর্দি অঞ্চলে কিছু সেনাসদস্য রয়ে গিয়েছিলেন।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ২০১১ সালে একটি অংশ ফিরে গেলেও, ২০১৪ সালে ইসলামিক স্টেট (আইএস) দমনের নামে পুনরায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।
সেনা প্রত্যাহারের এই ঘটনাকে ইরাকের জন্য নতুন যুগের সূচনা বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। তাঁর ভাষ্যমতে, এর মাধ্যমে ইরাক সব ধরনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হলো এবং পুরো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হলো। অন্যদিকে, ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক জয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে।
তবে এই প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ফালুজা অঞ্চলের আদিবাসী নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর। তাঁর মতে, নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরোপুরি এককভাবে নেওয়ার জন্য ইরাক এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় এবং মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার ফলে তৈরি হওয়া শূন্যতা সব ইরাকির জন্য বড় শঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার প্রতিবেশী দেশ ইরানের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ, ইরাকে বেশ কিছু ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। মার্কিন অনুপস্থিতিতে এই গোষ্ঠীগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে জানান, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট সরে যাওয়ায় কৌশলগতভাবে ইরান লাভবান হতে পারে, কারণ এতদিন এই বাহিনীগুলো দেশটিতে তেহরানের প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারসাম্য বজায় রাখত।
ইরাক থেকে দুই দশক পর মার্কিন সামরিক বাহিনীর পুরোপুরি প্রত্যাহার সম্পন্ন হয়েছে। দেশটির সরকার একে নতুন যুগের সূচনা বললেও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।


0 Comments