জন্মগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও নিজের মেধা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে কাগজের কলম ও খাতা তৈরি করে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার উত্তর ফলিয়া গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম। ২৯ বছর বয়সী এই তরুণ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। অর্থসংকটের কারণে পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে খাতা ও পরে কাগজের কলম তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি।
পরিবার ও শিক্ষাজীবন নিয়ে জানা যায়, শরিফুলের বাবা রফিকুল ইসলাম একজন মুদিদোকানি এবং মা মনোয়ারা বেগম গৃহিণী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে শরিফুল চতুর্থ। অডিও শুনে ও শ্রুতলেখকের সাহায্যে ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ালেখা করে তিনি ২০১৫ সালে এসএসসি এবং ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হয়ে ২০২১ সালে স্নাতক এবং ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০২২ সালে গাইবান্ধা শহরের তানিয়া আকতারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
কাগজের কলম তৈরির পেছনের গল্প সম্পর্কে শরিফুল জানান, ২০২৩ সালের মার্চে তিনি খাতা তৈরি শুরু করলেও ওই বছরের অক্টোবরে রংপুরের এক বন্ধুর মাধ্যমে কাগজ দিয়ে কলম তৈরির ধারণা পান। পরে যশোরের এক নারী উদ্যোক্তার কাছ থেকে কলম তৈরির পদ্ধতি শিখে নেন এবং নভেম্বর থেকে নিজেই তা তৈরি শুরু করেন। তাঁর তৈরি এসব পরিবেশবান্ধব কলমের নাম দেওয়া হয়েছে গ্রিন ইকোনমি। তাঁর মতে, প্লাস্টিকের কলমের তুলনায় এই কলমগুলো সহজে পচে যায় এবং পরিবেশের কম ক্ষতি করে। শরিফুলের স্ত্রী তানিয়া আকতার তাঁকে এসব কাজে সার্বিক সহযোগিতা করেন।
বর্তমানে শরিফুল দিনে প্রায় ৫০টি কলম এবং ১০০টি খাতা তৈরি করতে পারেন। একটি কলম তৈরিতে ৬ টাকা খরচ হয়ে ১০ টাকায় বিক্রি হয় এবং ১৫ টাকা খরচে তৈরি খাতা ২০ টাকায় বিক্রি করা হয়। সদর উপজেলার পুলবন্দি বাজারে তাঁর শরিফুল পেপার হাউস নামের একটি ছোট দোকান রয়েছে, যার মাসিক ভাড়া ৫০০ টাকা। প্রতি মাসে তাঁর ৯ থেকে ১০ হাজার টাকার খাতা ও কলম বিক্রি হলেও খরচ বাদ দিয়ে আয় হয় তিন থেকে চার হাজার টাকা। এই আয়ে সংসার না চলায় বাবা রফিকুল ইসলামের মুদিদোকানের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। মূলধনের অভাবে বড় পরিসরে কাজ শুরু করতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
শরিফুলের স্ত্রী তানিয়া আকতার জানান, স্বামী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হলেও তাঁকে নিয়ে তিনি গর্বিত এবং সব সময় তাঁকে উৎসাহ জোগান। পুলবন্দি গ্রামের স্কুলশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, শরিফুল সমাজের বোঝা না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁর এই উদ্যোগ অন্যদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত।
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে গাইবান্ধায় শুরু হতে যাওয়া বাণিজ্যমেলায় কলম ও খাতা বিক্রির জন্য একটি স্টল বরাদ্দ পেয়েছেন শরিফুল। আয়োজক গাইবান্ধা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি সামিউল হুদা জানান, মেলায় প্রায় ৭০টি স্টলের মধ্যে প্রতিবন্ধী ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতীকী ১০ টাকায় স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শরিফুল ইসলাম পরিবেশবান্ধব কাগজের কলম ও খাতা তৈরি করে আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। মূলধনের অভাব সত্ত্বেও অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে এগিয়ে চলা এই তরুণের উদ্যোক্তা জীবন অনেকের জন্যই অনুপ্রেরণা।

0 Comments