১৯১৭ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘Nationalism’ গ্রন্থে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বিশ্বকবির মতে, জাতীয়তাবাদ প্রায়শই সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রবাদী ধারণার সাথে সম্পৃক্ত, যা তিনি বর্জন করেছিলেন। এর বিপরীতে তিনি দেশপ্রেমকে একটি সংবেদনশীল অনুভূতি হিসেবে দেখেছেন, যা নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ড, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ আশীষ নন্দীর মতে, রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদকে একটি কৃত্রিম আদর্শ মনে করতেন যা ঔপনিবেশিক আমলে এশিয়া ও আফ্রিকার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’, ‘ঘরে-বাইরে’ এবং ‘চার অধ্যায়’ উপন্যাসে উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, জাতীয়তাবাদ অনেক সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে উসকে দেয় এবং সামাজিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ভারতের বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি মধ্যযুগের মরমী দার্শনিক কবীর, নানক ও লালন শাহের দর্শনকে মিলনের ভিত্তি হিসেবে কল্পনা করেছেন। মহাত্মা গান্ধীর মতো তিনিও মনে করতেন, সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মূলত সাম্রাজ্যবাদেরই নামান্তর। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে দেশপ্রেমের চেয়েও মানবতার স্থান ছিল অনেক উপরে। তিনি মনে করতেন, জাতীয়তাবাদ মানবতার জন্য একটি বড় হুমকি এবং বিশ্বশান্তির পথে প্রধান অন্তরায়।
জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের পার্থক্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী দর্শনের বিশ্লেষণ। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপরীতে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন মানবতা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনকে। জানুন বিশ্বকবির অনন্য রাজনৈতিক ভাবনা।

0 Comments