উখিয়ায় সেহরির সময় গৃহবধূ হত্যা: দেবর গ্রেপ্তার, উদ্ধার দা

কক্সবাজারের উখিয়ায় সেহরির সময় ঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এক গৃহবধূর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এলাকায় আতঙ্ক ও নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে এটি প্রায় ‘ক্লু-লেস’ একটি হত্যা মামলা ছিল।

ঘটনার সময় নিহতের স্বামী কর্মসূত্রে জেলার বাইরে ছিলেন। ঘরের দরজা ভেতর থেকে খোলা ছিল এবং পাশেই ঘুমিয়ে ছিল দুই ছোট সন্তান। কে এবং কেন এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাল—সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল সবার মনে।

শেষ পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ওই হত্যাকাণ্ডে নিহতের দেবর নুর শাহিন (১৮)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো দা উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের মুছারখোলা এলাকার বাসিন্দা জদিদা আক্তার (২২) প্রায় পাঁচ বছর আগে দিনমজুর শফিকুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে চার বছরের একটি ছেলে ও দুই বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।

প্রায় ২০ দিন আগে কাজের সন্ধানে শফিকুল ইসলাম বান্দরবান চলে যান। স্ত্রী জদিদা দুই সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতেই অবস্থান করছিলেন।

গত বুধবার (১১ মার্চ) ভোরে সেহরির সময় পরিবারের সদস্যরা তাকে ডাকতে গিয়ে ঘরের মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার গলায় একটি এবং মাথার পেছনে দুটি ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল।

খবর পেয়ে উখিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠায়।

ঘটনার পর নিহতের বাবা নুরুল ইসলাম অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে উখিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পুলিশ জানায়, ঘটনার শুরুতে মামলাটি প্রায় ‘ক্লু-লেস’ ছিল, কারণ ঘটনাস্থলে তেমন কোনো স্পষ্ট আলামত পাওয়া যায়নি। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করা হয়। সেই সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে পালংখালী ইউনিয়নের গয়ালমারা এলাকার এমএসএফ হাসপাতালের পাশের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নিহতের দেবর নুর শাহিনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে নুর শাহিন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জদিদা আক্তারের কাছে ৫০০ টাকা ধার চেয়েছিলেন। টাকা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান।

তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই অভিযান চালিয়ে পালংখালী ইউনিয়নের মুছারখোলা এলাকার চিত্তাখোলা খালের পাড় থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কাঠের হাতলযুক্ত ২১ ইঞ্চি লম্বা একটি ধারালো দা উদ্ধার করা হয়।

উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল আজাদ বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি একটি ক্লু-লেস মামলা ছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দ্রুত অভিযান চালিয়ে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুজিবুর রহমান জানান, গ্রেপ্তার আসামিকে শুক্রবার (১৩ মার্চ) বিকেলে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

তবে স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, মাত্র ৫০০ টাকা নিয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—এটি সহজে মেনে নেওয়া কঠিন। ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা পারিবারিক বিরোধ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে দুই ছোট সন্তানকে রেখে মায়ের এই করুণ মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয়রা প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

Post a Comment

0 Comments