প্রশাসন ক্যাডারের সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজনীতি, আন্দোলন সংগ্রামের দীর্ঘপথ এবং গুম হয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথবাক্য পাঠ করান।
এর আগে সকালে কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ সালাহউদ্দিন আহমদ।
১৯৯৬ ও ২০০১ সালে কক্সবাজার -১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জামায়াত ইসলামীর আব্দুল্লাহ আল ফারুখকে ৯২ হাজারেরও বেশি ভোটের বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে এই আসন থেকে চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন সালাহউদ্দিন আহমদ।
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কক্সবাজারের তৎকালীন চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সিকদার পাড়া গ্রামের সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক ও মাতা বেগম আয়েশা হকের পরিবারে সালাহউদ্দিন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৭৭ সালে পেকুয়ার শীলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৭৯ সালের এইচএসসিতেও দারুণ ফলাফল করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং কৃতিত্বের সাথে ১৯৮৪ সালে এলএলবি (সম্মান) ও ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি এবং কিছুদিন ভারপ্রাপ্ত সভাপতিও ছিলেন।
১৯৮৫ সালের ৭ম বিসিএস পরীক্ষায় (প্রশাসন) উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বগুড়া জেলা প্রশাসনের তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব পদ থেকে বদলি হয়ে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে আপোষহীন নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার পুত্রতুল্য সান্নিধ্য পাওয়া সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯৬ সালে চাকরি ছেড়ে আহবায়ক হিসেবে কক্সবাজার জেলা বিএনপির হাল ধরেন এবং একই বছরে পরপর দুটি সংসদ নির্বাচনে তিনি এমপি নির্বাচিত হন। তৃনমূলের কাউন্সিলে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে পরপর দুইবার কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করা সালাহউদ্দিন আহমদ ২০১০ সালে বিএনপি’র জাতীয় কাউন্সিলে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যুগ্মমহাসচিব মনোনীত হয়েছিলেন।
২০১৫ সালে দেশের রাজনীতির উত্তাল সময়ে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র মুখপাত্র হিসাবে দায়িত্বপালনকালে ওই বছরের ১০ মার্চ গুমের শিকার হন সালাহউদ্দিন আহমদ। দীর্ঘ ৬২ দিন পর ১১ মে মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় ভারতের শিলংয়ে তার খোঁজ পাওয়া যায়। ভারতের শিলং থাকা অবস্থায় তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মনোনীত হন।
শিলংয়ের কারাগারে বন্দি জীবন, নির্বাসনে থেকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে প্রায় ১০ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট নিজ মাতৃভূমিতে সালাহউদ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটে।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় নিজের শেষ নির্বাচনী সভায় সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, আমার বেঁচে থাকার কথা ছিল না, আমাকে গুম করা হয়েছিল হত্যার উদ্দেশে। আপনারা দোয়া করেছেন, রাব্বুল আলামিন আপনাদের মোনাজাত শুনেছেন এবং আমাকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন জীবন দিয়েছেন। আমার এই নতুন জীবন, এই বর্ধিত হায়াত এ দেশের মানুষের সেবা করার জন্য। আমার জন্ম হয়েছে এ দেশের উন্নয়নের জন্য, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, ব্যক্তিজীবনে চার সন্তানের জনক সালাহউদ্দিন আহমদ। এছাড়া তিনি জেলে থাকাকালে তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ ২০০৮ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
0 Comments