মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারের ১ হাজার ৪৭৬ জন অভিবাসীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত রবিবার তিনটি নৌযানে করে তারা মিয়ানমারে পৌঁছান। দেশটিতে চলমান গৃহযুদ্ধ ও ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো পরিস্থিতির মধ্যে এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মিয়ানমার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, তিনটি নৌযানে করে আসা এই ১ হাজার ৪৭৬ জনকে ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি প্রায় ৫ হাজার অভিবাসীকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সামগ্রিক পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে সাতটার আগেই মিয়ানমার নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ থানলিনের নৌঘাঁটিতে পৌঁছায়। প্রিয়জনদের স্বাগত জানাতে এ সময় নৌঘাঁটির বাইরে শত শত স্বজন অপেক্ষা করছিলেন। ৫৫ বছর বয়সি কিয়াও মিন্ট জানান, দেড় বছর ধরে মালয়েশিয়ায় আটক থাকা তার তিন নাতিকে গ্রহণ করতে তিনি সেখানে এসেছেন। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তাদের সঙ্গে তার কোনো দেখা হয়নি এবং কারাগারে যাওয়ার পর থেকে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে দেশে ফেরার পর তাদের জোরপূর্বক সামরিক বাহিনী বা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যুক্ত করা হতে পারে কি না, সে বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই দলের মধ্যে ২৭ শিশু ও ৭৯ নারী রয়েছেন এবং বাকি ১ হাজার ৩৭০ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। তবে প্রত্যাবর্তিত ব্যক্তিদের মধ্যে নিপীড়িত কোনো রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। যদিও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মিয়ানমারের শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের একটি বড় অংশই রোহিঙ্গা। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের দাবি, আটককেন্দ্রে থাকা সব অভিবাসী স্বেচ্ছাতেই নিজ দেশে ফিরতে সম্মত হয়েছেন। অন্যদিকে মিয়ানমার দাবি করেছে, ফেরত পাঠানোদের অনেকেই অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধে তাদের নির্ধারিত সাজা শেষ করেছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব আটককেন্দ্রের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা জানিয়েছে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা সত্যিই কোনো স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা যাচাই করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি। মালয়েশিয়া আরও সাড়ে তিন হাজারের বেশি মিয়ানমার অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, অভিবাসীরা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরির পাশাপাশি সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট সৃষ্টি করছে। এদিকে মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা এখনো থামেনি। গত মাসের শেষ দিকে রাখাইন রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্থানীয় বাজারে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় প্রায় ৫০ জনের প্রাণহানি ঘটে। পর্যবেক্ষণ সংস্থা এসিএলইডি-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে চলমান দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক মালয়েশিয়ার এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করে জানান, গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনে জর্জরিত কোনো দেশে কাউকে ফেরত পাঠানোর উপযুক্ত সময় এটি নয়। এছাড়া জাতিসংঘ বলছে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত মিয়ানমারে পাঠানো ব্যক্তিদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন এবং আন্তর্জাতিক আইনের শর্তগুলো বর্তমান পরিস্থিতিতে পূরণ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
মালয়েশিয়া থেকে মিয়ানমারে পাঠানো হলো প্রায় দেড় হাজার অভিবাসী। চলমান গৃহযুদ্ধ ও মানবাধিকার সংকটের মধ্যে এই প্রত্যাবাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।


0 Comments