খাগড়াছড়ির রামগড়ে চার দশক আগে সংঘটিত পাতাছড়া গণহত্যার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। ১৯৮৬ সালের ১৩ জুলাই রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের ডাকবাংলা এলাকায় তৎকালীন সশস্ত্র সংগঠন 'শান্তিবাহিনী'র বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারান বেশ কয়েকজন নিরীহ বাঙালি। সেই ভয়াবহ ঘটনার ৪০ বছর পূর্ণ হলেও আজও বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের স্বজনরা।
সেদিনের সেই নৃশংস হামলায় ৫ শিশুসহ একই দিনে ৭ জন নিহত হন। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গ্রামে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি ও অগ্নিসংযোগ চালায়। এর কয়েকদিন পর আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ১৩ আগস্ট মো. আদম ছফি উল্লাহ নামে এক স্থানীয় বাসিন্দাকে অপহরণের পর হত্যা করে মরদেহ ফেনী নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। এই হামলার পর আতঙ্কিত হয়ে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়, যাদের অনেকেই আজও নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরতে পারেননি।
প্রত্যক্ষদর্শী মো. নাসির উদ্দিন সেই দিনের বর্ণনা দিয়ে জানান, মাগরিবের আগে সন্ত্রাসীরা তাদের বাড়িতে ঢুকে গুলি শুরু করে এবং ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার ছোট ভাই আবুল কাশেমকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। মা হালিমা বেগম তার এক বছর বয়সী বোন আনোয়ারাকে বাঁচাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন এবং সন্ত্রাসীরা শিশু আনোয়ারাকেও আগুনে নিক্ষেপ করে। আরেক বোন মনোয়ারাকে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়। অপর প্রত্যক্ষদর্শী নজরুল ইসলাম তার মা ছবুরী খাতুনকে জবাই এবং বোন রেহানা আক্তারকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।
তথ্যমতে, এই গণহত্যায় নিহতরা হলেন— হালিমা বেগম (৫৫), মনোয়ারা বেগম (৬), আবুল কাশেম (৫), আনোয়ারা বেগম (১), ছবুরী খাতুন, রেহানা আক্তার এবং মফিজা খাতুন। পরদিন ১৪ জুলাই মো. সাত্তার নামে আরও একজনকে হত্যা করা হয়।
তৎকালীন আনসার সদস্য মো. মমতাজ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বহু ঘটনার নথিপত্র থাকলেও পাতাছড়ার এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি কোনো সরকারি নথিতে স্থান পায়নি। বর্তমানে স্থানীয়রা ডাকবাংলা এলাকার সেই গণকবরটি সংস্কার করে প্রতি বছর দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, রাষ্ট্রীয় নথিতে এই গণহত্যার অন্তর্ভুক্তি, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হোক।
খাগড়াছড়ির রামগড়ে ১৯৮৬ সালের পাতাছড়া গণহত্যার ৪০ বছর পেরিয়ে গেলেও মেলেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। স্বজন হারানোদের কান্না আর বিচারের দাবিতে আজও ভারী হয়ে ওঠে ডাকবাংলা এলাকার বাতাস।
-6a55e7da424dd.webp)

0 Comments