জলপাই বা হলদেটে বাদামি রঙের ওপর কালচে ছোপযুক্ত বিচিত্র এক মাছের নাম বামুস। একসময় দেশের হাওরাঞ্চল ও নদ-নদীতে এই মাছের নিয়মিত দেখা মিললেও বর্তমানে এটি বিলুপ্তির পথে। এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতেও এখন এই মাছ খুব একটা ধরা পড়ে না। এলাকাভেদে এটি বামোস, বাউস, বানেহারা বা তেলকোমা নামেও পরিচিত। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Anguilla bengalensis bengalensis এবং ইংরেজিতে এর নাম ইন্ডিয়ান মটলড ইল।
অ্যাঙ্গুইলিডি পরিবারের সদস্য এই মাছটি দেখতে অনেকটা বাইম মাছের মতো। এর শরীর লম্বাটে এবং চামড়া বেশ তেলতেলে। পূর্ণবয়স্ক একটি বামুস মাছ সাধারণত এক মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ১২০ সেন্টিমিটারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই মাছের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর জীবনচক্র। এরা সমুদ্রে জন্মগ্রহণ করে এবং মিঠাপানিতে বেড়ে ওঠে। জীবনের শেষ পর্যায়ে ডিম পাড়ার জন্য এরা পুনরায় লোনাজলে ফিরে যায় এবং সেখানেই মারা যায়।
বঙ্গোপসাগরের গভীর তলদেশে জন্ম নেওয়া এই মাছের লার্ভাগুলো স্রোতে ভেসে একসময় নদীর মোহনায় পৌঁছায়। এরপর পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও কর্ণফুলীর মতো বড় নদী হয়ে এরা পাহাড়ি ঝরনাধারা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সেখানে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর অবস্থান করে ছোট মাছ, চিংড়ি ও জলজ উদ্ভিদ খেয়ে এরা বড় হয়। পরবর্তীতে প্রজননের তাগিদে পুনরায় সমুদ্রের দিকে যাত্রা শুরু করে।
একসময় কর্ণফুলী জলাধার থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এই মাছের ব্যাপক বিচরণ ছিল। ভৈরব সেতুর আশেপাশেও প্রচুর বামুস মাছ ধরা পড়ত। তবে বর্তমানে আইইউসিএন বাংলাদেশের লালতালিকায় এই মাছটিকে সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নদী দখল, বাঁধ নির্মাণ, দূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে এদের আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নদীতে বাঁধ দেওয়ার ফলে এদের প্রজননকালীন সমুদ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা এই প্রজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
সমুদ্রে জন্ম আর মিঠাপানিতে বেড়ে ওঠা বিচিত্র বামুস মাছ এখন বিলুপ্তির পথে। নদী দখল ও দূষণে সংকটাপন্ন এই মাছের জীবনচক্র ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত জানুন।

0 Comments