গণতন্ত্রের বিজয়ের দিনে অনুপস্থিত দেশনেত্রী খালেদা জিয়া

সিবি ডেক্স: দীর্ঘ সংগ্রামের পর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করতে পারেননি গণতন্ত্র ও জনগণের প্রশ্নে আপসহীন নেত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

গত ৩০ ডিসেম্বর না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভোগার পাশাপাশি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন আপসহীন রাজনীতির প্রতীক ও দেশে-বিদেশে জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। গত বছরের ৫ আগস্ট কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ছিলেন বন্দিজীবনে।

গতকাল দেশব্যাপী বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন হয়। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারা ভোটারদের মধ্যে দেখা যায় বাড়তি উচ্ছ্বাস। সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই দিনটিকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস হিসেবে অভিহিত করেছে।

বিএনপির নেতাকর্মীরা আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, যে নেত্রী আজীবন দেশের মানুষ ও গণতন্ত্রের পক্ষে অবিচল ছিলেন, যিনি কখনো জনগণের স্বার্থে আপস করেননি, সেই খালেদা জিয়া এই ঐতিহাসিক দিনটি দেখে যেতে পারেননি। বেঁচে থাকলে তিনিই হয়তো সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন।

গত রাত আড়াইটার দিকে বেসরকারি ফল অনুযায়ী, বিএনপি ১৭০টি আসনে জয়লাভ করেছে। বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা ও বগুড়া—দুটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

দীর্ঘ ১৭ বছর তারেক রহমান নির্বাসনে থাকাকালে দল ও আন্দোলনের ভার বহন করেছেন খালেদা জিয়া। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছেলের নেতৃত্বে দলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এবং দেশের দায়িত্ব গ্রহণের এই মাহেন্দ্রক্ষণও তিনি দেখে যেতে পারেননি।

দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে সব সময় ‘দেশনেত্রী’ বলে সম্বোধন করলেও মৃত্যুর আগে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক জাতীয় অভিভাবক। ক্ষমতার মোহে নয়, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমে দৃঢ়চেতা এই নেত্রী রাজনীতিতে ছিলেন ধৈর্য, আত্মমর্যাদা ও আপসহীনতার প্রতীক।

রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত হয়। ২০০৭ সালে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশত্যাগের চাপের মুখে তিনি বলেছিলেন, দেশের বাইরে তাঁর কোনো ঠিকানা নেই, বাংলাদেশই তাঁর একমাত্র ঠিকানা।

ঘটনাচক্রে রাজনীতিতে আসা এক সাধারণ গৃহবধূ থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন রাজনীতির প্রতীক। বন্দিত্ব, অপমান ও একাকিত্বের মধ্যেও তিনি বলেছিলেন, দেশবাসীই তাঁর স্বজন।

গণতন্ত্রের বিজয় ও দলের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের প্রাক্কালে তাই নেতাকর্মীদের হৃদয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন বেগম খালেদা জিয়া—এক অবিচল, দৃঢ়চেতা ও আত্মত্যাগী নেত্রী হিসেবে।

Post a Comment

0 Comments