কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের নিখোঁজ হওয়ার আগের কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলের রেজিস্টারে তানজু আক্তার নামে এ পরিচয় দিয়ে বয়স ১৮ বছর দেখিয়েছিলেন ওই শিক্ষার্থী। সেখানে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর স্ত্রী হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। তাজমিনের কক্সবাজার ভ্রমণ, রাজুর সঙ্গে সেখানে অবস্থান এবং বাড়ি ফেরার ঘটনাগুলো প্রকাশের পর তার চলাফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে হোটেলে দেওয়া পরিচয়ের তথ্য এবং রাজুর সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাজমিন প্রথমে প্রতিবেশী জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। পরবর্তীতে কুমিল্লায় ফিরে সেখান থেকে সে কক্সবাজারে যায় বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। বাড়ি ছাড়ার সময় মাকে সে এক বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা জানিয়েছিল। তবে ঠিক কোন সময়ে সে কক্সবাজারে গিয়েছিল, তা নিশ্চিত করা যায়নি। কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কর্মরত রাজুর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে তাজমিনের পরিচয় হয়। হোটেলটির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ফেসবুকে পরিচয়ের প্রায় ১৭ দিনের মাথায় তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর তাজমিন কক্সবাজারে গিয়ে ঘোরাফেরা করে পুনরায় ফিরে আসে। ওই কর্মীর দাবি, রাজু বারবার তাকে জানিয়েছেন যে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন এবং নিজেকে বাঁচানোর আকুতি জানিয়েছেন। ঘটনার পর রাজু হোটেল ছেড়ে ছুটিতে রয়েছেন বলে জানান ওই কর্মী। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি হলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া। রাজুর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কক্সবাজারের কক্সেস প্যানারেমিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহ জানান, গত মঙ্গলবার রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু তাদের কাউন্টারে বাসের টিকিট কাটতে যান। তখন সাধারণ যাত্রী হিসেবেই দুজনকে দেখেছিলেন তিনি। আবদুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজু পরদিন বুধবারের জন্য একটি টিকিট সংগ্রহ করেন। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসটি কুমিল্লার উদ্দেশে কক্সবাজার ছাড়ে। পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে বাসে যাওয়া ওই তরুণীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন আবদুল্লাহ এবং বুঝতে পারেন যে তিনিই তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত বুধবার কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোড এলাকার হোটেল নূরজাহানের কাছে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে নামেন তাজমিন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ১২টার দিকে সেখান থেকে শহরের রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি। ওই অটোরিকশার চালক ছিলেন সুমন মিয়া। পুলিশের দাবি, সুমন তাজমিনকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন তাজমিন এক বান্ধবীর সঙ্গে থাকার কথা জানিয়েছিল। মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে বান্ধবীর বাড়িতে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি এবং বান্ধবীর নাম ও তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাজমিন তা জানাননি। কেয়া খাতুন আরও বলেন, মেয়ের বন্ধুবান্ধব ও চলাফেরা নিয়ে তিনি আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং কোনো অঘটনের আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, দীর্ঘদিন তিনি তাজমিনকে পড়িয়েছেন এবং সে খুবই চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ থাকলে সে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত। শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাবা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং সকালে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে বাসায় রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বাইরে চলে যেত। অন্যদিকে, সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় ও সম্পর্ক না হলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না এবং এমন বিপদের মুখে পড়তে হতো না। এ বিষয়ে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, হোটেলে দেওয়া পরিচয় এবং বাড়ি ফেরার পরের ঘটনাগুলো তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে সুমন মিয়াকেই অভিযুক্ত করেছে এবং হত্যাকাণ্ডের আগের ঘটনাগুলো নিশ্চিত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
কুমিল্লায় স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যা মামলার তদন্তে উঠে এসেছে কক্সবাজার যাত্রা ও ফেসবুক পরিচয়ের নতুন তথ্য। পুলিশ জানিয়েছে, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত।


0 Comments