জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির শীর্ষস্থানীয় সাত নেতাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। শীর্ষ নেতৃত্বের দায় বা ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র আওতায় এ দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ছয় আসামি হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। দণ্ডিত সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছেন। বাজেয়াপ্ত এসব সম্পত্তি বিক্রি করে জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা নির্ধারিত বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে শহীদ পরিবার ও আহতদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায় ঘোষণার প্রারম্ভে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার বেশি এই রায়ের মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা ও বিচার প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশন, তদন্ত কর্মকর্তা এবং সাক্ষীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। রায়টি মূলত ইংরেজিতে প্রস্তুত হলেও তা বাংলায় সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়।
মামলার রায়ে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিবরণ তুলে ধরা হয়। ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আনা চারটি অভিযোগের সব কটি প্রমাণিত হওয়ায় তিনটিতে মৃত্যুদণ্ড এবং একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে আনা চারটির মধ্যে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং একটি থেকে খালাস দেওয়া হয়। মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে আনা চারটির মধ্যে দুটিতে মৃত্যুদণ্ড, একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং একটি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড, একটিতে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং একটি থেকে খালাস দেওয়া হয়। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের বিরুদ্ধে চারটি অভিযোগের সব কটি প্রমাণিত হওয়ায় প্রত্যেককে দুটি বা তিনটি করে অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিগুলোতে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ দেন, নিজ নিজ সংগঠন, দল কিংবা সরকারের ওপর আসামিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। তা সত্ত্বেও গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে নেতাকর্মীদের সহিংস অপরাধ থেকে বিরত রাখতে কিংবা অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।
রায়ের পর ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, আসামিদের ব্যক্তিগত ও কমান্ডের দায় প্রমাণিত হয়েছে। পলাতকদের বিষয়ে আইন অনুযায়ীই বিচার সম্পন্ন হয়েছে। অপরদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী ইসরাত জাহান ও এম হাসান ইমাম রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন মামলার সাক্ষী রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশরাফ কায়সার, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহিন সরকার এবং শহীদ মেহেরুন্নেসা তানহার পিতা মোশারফ হোসেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৮ জুন শুরু হওয়া এ তদন্তের প্রক্রিয়া ৪৫৪ দিন পর রায়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হলো।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে পাঁচ আসামির অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


0 Comments