নিজস্ব প্রতিবেদক:
সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ সদর ভূমি অফিসে সীমাহীন দূর্নীতি ও দালাল চক্রের দৌরাত্মে লাগামহীন হয়ে পড়েছে। এতে ভূমিসংক্রান্ত প্রত্যেকটি কাজে জিম্মি হয়ে পড়েছে দূরদূরান্তের থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীরা। বিশেষ করে তহশিলদার ও অফিস কর্মচারীদের যোগসাজশে এই সরকারি অফিস এখন দালাল এর স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, অভিযোগ স্থানীয়দের।
এসব অভিযোগের বাস্তব চিত্র দেখা গেছে সরকারের আয়োজিত ‘ভূমিসেবা মেলায়'। গত মঙ্গলবার (২০ মে) টেকনাফ ভূমি অফিসে আয়োজিত ভূমিসেবা মেলা চলাকালে ভূমি অফিসের একটি স্টলে বহিরাগত দালাল, ইয়াছের সরকারি অফিসের একটি স্টলে নারীকে ভূমি উন্নয়ন কর-সংক্রান্ত সেবা দিতে দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি ভূমি অফিসের কোনো কর্মচারী নন ইয়াছের। স্হানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে টেকনাফ সদর ভূমি অফিসে তহসিলদারদের বড়ো বড়ো কাজের কন্ট্রাক্ট করতো ইয়াছিরের চাচাতো ভাই আকতার। যিনি এখনো সরকারি অফিসারদের মতো অফিসে বসে সব ভূমিসংক্রান্ত কাজের দালালি করে। পরে আকতার দালাল হিসেবে সিনিয়র হয়ে গেলে ৪/৫ বছর পূর্বে অপর চাচাতো ভাই ইয়াছেরকে নিয়ে আসে তহশিলদার অফিসে। এর পর থেকে দুই ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে চলছে এই সরকারি অফিস। বর্তমান তহশিলদার আবুল কাসেম অধীনে ইনকাম এর হাতিয়ার হয়ে কাজ করে ইয়াছের ও তার ভাই আকতার। তহশিলদার এর পাশের কক্ষগুলোতে ডেক্স নিয়ে বসার ব্যবস্হা-ও রয়েছে তাদের।
অফিসের রেকর্ড রুমসহ সব জায়গায় ইয়াছের এর বিচরণ। রেকর্ড রুম সব দস্তাবেজ তথা নথিপত্র চালাচাল করছে সে। এছাড়া ভূমি অফিস ঘিরে ইয়াছের তৈরি করেছে নিজস্ব আর-ও দালাল বাহিনী। যাদের দিয়ে তহশিলদার হয়ে ভূমিসংক্রান্ত সকল কাজ চুক্তিভিত্তিক রফাদফা করে এই দালাল। এছাড়া সুযোগ বুঝে সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের নিজেকেও সাংবাদিক পরিচয় দিতে দ্বিধা করেনা তিনি। এই দালাল ইয়াছের এর বির“দ্ধে কোন পেশাদার সাংবাদিক রিপোর্ট করতে গেলেই তার দালাল বাহিনী দিয়ে সাংবাদিকদের কৌশলে অপদস্ত করার চেষ্টা করে। এই নিয়ে স্হানীয় পেশাদার সাংবাদিকদের মাঝেও পুঞ্জীভূত, অসন্তোষ,ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্ম নিয়েছে।
এছাড়া ভুলবোঝাবুঝি সৃষ্টি হচ্ছে। সরকারি অফিসে সেবাপ্রত্যাশীদের দস্তাবেজ বা নথিপত্র বহিরাগত দালালদের নাড়াচাড়া করার কোনো আইনি বা দাপ্তরিক অধিকার না থাকলেও সম্পূর্ণ গোপনীয়তা লঙ্ঘন করছে এই দালাল ইয়াছের।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সংশ্লিষ্ট তহশিলদার ম্যানেজ করেই, তাদের ইনকামের হাতিয়ার হিসেবে দু’ভাই এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বহুবছর ধরে।
সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, "সরকারি ভূমিসেবা মেলায় অনুমোদিত ব্যক্তিকে দিয়ে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে দালাল চক্রকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে এবং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় মানুষকে দালাল নির্ভর করছে"।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির প্রভাবশালী সদস্য টেকনাফ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড এর কাউন্সিল'র পদপ্রার্থী মো: রেজা, সাবরাং এলাকার কামরুল, দেলোয়ার, শাহপরীর দ্বীপ এর মোহাম্মদ সামি, হাসেনসহ স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টেকনাফ ভূমি অফিস এর অবস্থা খুবই খারাপ। সেবাপ্রত্যাশীদের সম্পূর্ণ জিম্মি করে রেখেছে এই দালাল চক্র। তাদের ম্যানেজ করে জমি সংক্রান্ত কাজ করতে হচ্ছে। না হয় মাসের পর মাস অফিসে ঘুরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। মূলত অফিস কর্তা ও সংশ্লিষ্ট তহশিলদাদের দুর্বলতার কারণে মানুষ দালাল নির্ভর হতে বাধ্য করেছে। কারণ দালালরা হচ্ছে তাদের ইনকামের হাতিয়ার। না হয় দালালরা কেমনে সরকারি অফিসে বসে কাজ করে এবং অফিস প্রাঙ্গনে তাদের সরাক্ষণ বিচরণ থাকে? আর সরকারি মেলায় অফিসের বাইরের লোক দিয়ে সেবা দেওয়ার অর্থ হলো দালালদের প্রমোট করা। এটি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করা’।
এই নেতা আরও জানান, ”তিনি নির্বাচিত হলে টেকনাফ ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসসহ যে সরকারি অফিসগুলোতে জনভোগান্তি রয়েছে এগুলো নিরসন করার জন্য সাধারণ মানুষের হয়ে কাজ করবেন তিনি।”
সেবাপ্রত্যাশীরা আরও বলেন, ‘ভূমিসেবা মেলায়ও যদি দালাল দিয়ে সেবা দেওয়া হয়, তাহলে বোঝাই যায়, সারা বছর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ হয়। আমরা এর নিন্দা জানাই।’মুলত তহশিলদার কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বহিরাগতকে নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।'
স্হানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন ভূমি অফিসের আশপাশে ২০ থেকে ২৫ জন দালাল অবস্থান করে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, খতিয়ান, নামজারি ও জমিজমা সংক্রান্ত কাজে আসা সেবাপ্রার্থীরা দালাল ইয়াছের ও তার সহযোগী দালালদের খপ্পরে পড়তে বাধ্য হন। বিশেষ করে তহসিল অফিসকে কেন্দ্র করে এই দালাল আরও দালাল চক্র সৃষ্টি করে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ স্থাপন করে সেবাপ্রার্থীর কোনো ফাইল মুভ করে না; লাল ফিতায় আবদ্ধ থাকে দীর্ঘদিন। মূলত সর্ষের মধ্যে ভূত" আঁষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এসব ‘ভূতদের’ কারণে সহকারী কমিশনার (ভূমি)'র দুর্বলতায় অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী জানান-নাম প্রস্তাব, সার্ভে রিপোর্ট, দাখিলা গ্রহণ, পর্চা, নামজারি, ডিসিআর সংগ্রহ, খাজনা দাখিল, খতিয়ান ইস্যু এমনকি জমি ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমতি-সব ক্ষেত্রেই সরকারি নিয়মের বাইরে অনৈতিক লেনদেন করতে বাধ্য করায় এই দালাল ইয়াছের। এছাড়া নামজারির ফাইলে ই”ছাকৃতভাবে ‘রেকর্ডে মিল নেই’ বা ‘দখল নাই’ লিখে বিভ্রান্ত করা হয় এবং পরে অনৈতিক সুবিধা নেয়। আর তাঁর সাথে মোটা অংকের বিনিময়ে কন্ট্রাক্টে গেলে সব টিক থাকে। এই বহিরাগত দালাল ইয়াছের চক্রকে সরকারি ভূমি অফিস থেকে বিতাড়িত করার দাবি স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, "আমি সদ্য যোগদান করেছি,ভূমি অফিসে দ্রুত দালাল নির্মূল করার জন্য এসিল্যান্ডকে নির্দেশ প্রধান করা হয়েছে। আশা করি রেজাল্ট পাবেন"।
এ বিষয়ে সদর তহশিলদার আবুল কাশেম এর মুঠোফোনে কল করলে রিসিভ করেনি এবং ম্যাসেজ পাঠালে-ও কোন উত্তর দেয়নি। এছাড়া সদর উপজেলা টেকনাফ সহকারী কমিশনার (ভূূমি) কেও ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
এবিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ আঃ মান্নান বলেন, 'কোন দলাল ও বহিরাগত ভূমি অফিসে থাকতে পারবে না এবং তাদের কারণে সরকারের এই ভূমি সেবা প্রশ্নবিদ্ধ হউক, সেটা মেনে নেওয়া যাবে না। দালাল ইয়াছেরসহ এই চক্রের নাম ও ছবি দেন, আমি ব্যবস্হা নিচ্ছি'।
টেকনাফ সদর ভূমি অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও ভূমিসেবা মেলায় বহিরাগত দিয়ে সেবা দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

0 Comments