বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো এ দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষ। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকরা কতটা পাচ্ছেন, তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে। বর্তমানে দেশে শ্রমবাজারে সক্রিয় জনবলের সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ১৭ লাখ, যার মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের জিডিপিতে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান ৮৮ শতাংশের বেশি হলেও মোট শ্রমশক্তির ৮৪ শতাংশই এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত।
অর্থনীতির দুই প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাক খাত এবং প্রবাসী আয় মূলত শ্রমিকদের ঘাম ও মেধার ওপর দাঁড়িয়ে। প্রায় ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের বড় অংশই নারী এবং দেড় কোটির বেশি প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো রেমিট্যান্স গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে। তবে এই বিপুল অবদানের বিপরীতে শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তার চিত্রটি এখনো ভঙ্গুর। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সীমিত মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক শ্রমিকই সামাজিক নিরাপত্তা ও বিমা সুবিধার বাইরে রয়ে গেছেন।
শ্রমিকদের এই সংকট উত্তরণে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে কেবল ব্যাংক হিসাব খোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত ক্ষমতায়নে রূপান্তরের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নামমাত্র খরচে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দিলেও সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকবান্ধব আর্থিক পণ্য, কর্মস্থলভিত্তিক আর্থিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল বেতন ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
শ্রমিককে কেবল উৎপাদন খরচ হিসেবে না দেখে ‘মানবপুঁজি’ হিসেবে বিবেচনা করা হলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শ্রমিকদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা দয়া নয়, বরং এটি সময়ের দাবি ও একটি সুচিন্তিত অর্থনৈতিক কৌশল। মে দিবসের অঙ্গীকার হওয়া উচিত শ্রমিককে উন্নয়নের প্রান্তে নয়, বরং কেন্দ্রের অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি শ্রমজীবী মানুষের অবদান অনস্বীকার্য হলেও তাদের আর্থিক নিরাপত্তা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে প্রবৃদ্ধির সুফল শ্রমিকদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে প্রয়োজন কার্যকর আর্থিক ক্ষমতায়ন।
সূত্র: প্রথম আলো

0 Comments