দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, প্লাস্টিক দূষণ এখন আর কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা অত্যন্ত নীরবে মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রবেশ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক ধরা পড়া আসলে আমাদের অসচেতন কৃষি ও পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার একটি চূড়ান্ত পরিণতি।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি দুধে তৈরি হয় না। এগুলো মূলত কৃষিজমি, পশুখাদ্য এবং খামারের পানির মাধ্যমে প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করে। শিল্পবর্জ্য মিশ্রিত পানি দিয়ে সেচ প্রদান, জমিতে স্লাজ সার ও প্লাস্টিক মালচিংয়ের ব্যবহার মাটিকে দূষিত করছে। এছাড়া পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে ঘাস ও খড়ের মাধ্যমে গবাদিপশুর শরীরে ঢুকছে। বাণিজ্যিক পশুখাদ্য প্লাস্টিকের বস্তায় পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় ঘর্ষণের ফলে তৈরি হওয়া ক্ষুদ্র কণাগুলোও খাদ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
প্রাণীর শরীরে এই প্লাস্টিক কণার প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। এটি গবাদিপশুর অন্ত্রে প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এছাড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া জমে এক ধরনের জৈব আস্তরণ তৈরি করে, যা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাপজনিত চাপের কারণে প্রাণীর অন্ত্রের সুরক্ষা প্রাচীর দুর্বল হয়ে পড়লে মাইক্রোপ্লাস্টিক সহজেই রক্তপ্রবাহে মিশে দুধের মাধ্যমে মানবদেহে পৌঁছায়।
বর্তমানে দেশে পশুখাদ্য বা কৃষিজমির পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কেবল বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করার প্রবণতা থাকলেও খামার পর্যায়ের দূষণ নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিরাপদ দুধ নিশ্চিত করতে হলে বাজার তদারকির পাশাপাশি খামার পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। পশুখাদ্যের প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিকের বিকল্প ব্যবহার এবং কৃষিজমির পানির মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। কেবল বাজার তদারকি নয়, বরং খামার পর্যায় থেকেই এই দূষণ রোধে নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পশুখাদ্য ও পানির মান নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি।


0 Comments