চুয়াল্লিশ বছর বয়সের এক দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের জীবন দর্শনের এক অনন্য চিত্র ফুটে উঠেছে তার অভিজ্ঞতায়। যেখানে মানুষের বয়স ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়, বরং ভাঙা চোয়াল আর অপূর্ণ স্বপ্নের সংখ্যা দিয়ে মাপা হয়। এক ভোরে নিজের বালিশের নিচে একটি নীল শামুক দেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার এক পরাবাস্তব যাত্রা। সেই শামুকটি তাকে নিয়ে যায় মাটির নিচে অবস্থিত এক বিশাল শহরে, যার নাম নীল শামুক বিশ্ববিদ্যালয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে লেখা ছিল সত্যানুসন্ধানে আগত অপ্রকাশিত অতিথিদের স্বাগতম জানানোর বার্তা। সেখানে লেখক দেখতে পান হাজার হাজার মানুষ বসে আছেন, যারা মূলত কবি, বিজ্ঞানী বা আবিষ্কারক হতে চেয়েছিলেন কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে তাদের স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কেউ রাইট ভাইদের আগে বিমান তৈরির কথা ভেবেছিলেন তো কেউ মহাকাব্য লিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতেই তাদের সব সময় ব্যয় হয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গ্রন্থাগারে গিয়ে তিনি দেখেন লক্ষ লক্ষ বইয়ের মলাট থাকলেও ভেতরে কোনো লেখা নেই। গ্রন্থাগারিক তাকে জানান, এগুলো সেই সব বই যা কখনো লেখা হয়নি। সেখানে নিজের নামের একটি বই খুঁজে পেয়ে তিনি অবাক হন, যার ভেতরটা ছিল সম্পূর্ণ সাদা। গ্রন্থাগারিক তাকে মনে করিয়ে দেন যে, নিজের জন্য খাতায় লেখা আর পৃথিবীর জন্য বইয়ে লেখার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
শহরের শেষ প্রান্তে একটি পাহাড়ে তিনি নিজের জীবনের বিভিন্ন বিকল্প রূপ দেখতে পান। কোনোটিতে তিনি ধনী, কোনোটিতে বিখ্যাত বা ক্ষমতাবান। তবে একটি ঘরে তিনি নিজেকে দেখতে পান বর্তমানের মতোই দরিদ্র অবস্থায়, কিন্তু সেখানে তিনি নিরলসভাবে লিখে যাচ্ছেন। সেই সত্তার কাছে গল্প লেখা আর সফল হওয়া এক বিষয় নয়। শেষ পর্যন্ত ঘুম ভাঙলে তিনি উপলব্ধি করেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দারিদ্র্য অর্থের অভাব নয়, বরং অলিখিত গল্পের অভাব। এই বোধ থেকেই তিনি নতুন করে লিখতে শুরু করেন।
দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট এক মানুষের স্বপ্নে দেখা নীল শামুক বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে জমা আছে পৃথিবীর সব অলিখিত গল্প আর অপূর্ণ স্বপ্ন। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা কি কেবল সফলতায় নাকি নিরন্তর সৃষ্টিতে?


0 Comments