বাংলাদেশে বর্তমানের সহিংস উগ্রবাদ কেবল দেশীয় নয়, বরং এটি এখন ‘ট্রান্সন্যাশনাল’ বা আন্তঃদেশীয় রূপ নিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হুমকি মোকাবিলায় রাষ্ট্রকে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একদিকে উগ্রবাদকে অস্বীকার করলে রাষ্ট্র ঝুঁকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদের ভাষাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে প্রকৃত হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই দুর্বল হয়ে যাবে।
সম্প্রতি সরকারি নথির বরাত দিয়ে জাতীয় সংসদ, শাহবাগ, উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র এবং বিভিন্ন বাহিনীর স্থাপনায় হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এমনকি প্রশিক্ষিত বাহিনীর ভেতরেও উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের প্রবেশের চেষ্টার মতো ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে উগ্রবাদীরা কেবল দুর্গম এলাকায় নয়, বরং ফেসবুক, ইউটিউব ও পডকাস্টের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালাচ্ছে। তারা ধর্মকে ব্যবহার করে রাষ্ট্র, সমাজ, বিচারব্যবস্থা ও ভিন্নমতকে টার্গেট করছে।
উগ্রবাদের এই হুমকি এখন আর দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবানের (টিটিপি) সঙ্গে বাংলাদেশি নাগরিকদের যুক্ত হওয়ার খবর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি সতর্কবার্তা। তবে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটির রাজনৈতিক অপব্যবহার একটি বড় সংকট তৈরি করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে এই শব্দ ব্যবহার করায় জনআস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, যা প্রকৃত উগ্রবাদীদের বিকাশের পথ তৈরি করে দিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর আধুনিকায়ন ও সংস্কার জরুরি। সিটিটিসি, এসবি ও এটিইউ-এর মতো সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে আইন মেনে কাজ করতে হবে। উগ্রবাদ দমনে কেবল রাষ্ট্রীয় অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মাদ্রাসা ও গণমাধ্যমকে এই লড়াইয়ের অংশ হতে হবে। ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সহিংস উগ্রবাদকে আলাদা করে দেখে একটি সমন্বিত জাতীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমেই দেশকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশে সহিংস উগ্রবাদের নতুন ঝুঁকি ও জাতীয় নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। উগ্রবাদ এখন কেবল দেশীয় নয়, বরং আন্তঃদেশীয় রূপ নিয়েছে। এই হুমকি মোকাবিলায় রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ করে জনআস্থা অর্জন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার জরুরি।

0 Comments